ঢাকা, ৯ অক্টোবর ২০২৬ | চ্যানেল এস৫ অনলাইন:
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা নিয়ে আগামীকাল শনিবার উদযাপিত হবে শুভ মহালয়া। এদিন চণ্ডীপাঠ, বিশেষ পূজা ও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষের আনুষ্ঠানিক আবাহন। মহালয়াকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে নেওয়া হয়েছে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহালয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি তিথি। পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনালগ্ন হিসেবে দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এদিন প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় অনেকে জল, তিল ও অন্ন নিবেদন করে তর্পণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
পুরাণের বর্ণনা অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরসহ দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দেবতাদের দেওয়া বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। মহালয়ার সঙ্গে এই পৌরাণিক কাহিনির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দিনটি তাই অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানোর ঐতিহ্য রয়েছে। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ পূজা, চণ্ডীপাঠ ও মহালয়ার ঘট স্থাপনের আয়োজন করা হবে। মহালয়ার মধ্য দিয়েই ভক্তদের মধ্যে দুর্গাপূজার আনন্দ ও উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
মহালয়া উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভোরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মহালয়া অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া রমনা কালী মন্দিরেও শনিবার ভোরে মহালয়া উদযাপিত হবে বলে জানিয়েছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মিন্টু বসু। ঢাকাস্থ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগের লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, রামসীতা মন্দির এবং জয়কালী মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে বিশেষ ধর্মীয় আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী এ বছর দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে এবং গমন নৌকায়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদানের পরিমাণ ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিসহ ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি উপভোগ করতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা।
এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন পূজা কমিটি ও মন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্যান্ডেল নির্মাণ, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজ এগিয়ে চলছে। উৎসবের সময় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দুর্গাপূজা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এই উৎসব পরিণত হয় মিলনমেলায়। শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে সেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়বে দেশজুড়ে।