ঢাকা, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | চ্যানেল এস৫ অনলাইন
জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি আধুনিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ।
রোববার সকালে সাভার সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড (জাতীয় পতাকা) প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, একটি শক্তিশালী ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবল বাড়ালেই চলবে না। এর পাশাপাশি শৃঙ্খলা, পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক বাহিনীতে চেইন অব কমান্ডের যথাযথ অনুসরণও অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড কোনো ইউনিটের জন্য শুধু সম্মাননা নয়; বরং এর পেছনে থাকা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পেশাগত সাফল্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি। জাতীয় পতাকার মর্যাদা সমুন্নত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেক সদস্যকে অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। বিভিন্ন সময়ে এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হলেও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং এর বিরুদ্ধে বাঙালি সেনাসদস্যদের সশস্ত্র প্রতিরোধের কথা উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সেনাসদস্যদের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে সেনা কর্মকর্তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গৌরব ও অনুপ্রেরণার উৎস। দেশের জনগণ সেনাবাহিনীর সাফল্যকে জাতীয় সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখে।
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধান, প্রচলিত আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রতি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আধুনিক যুদ্ধের কৌশল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা এখন জাতীয় প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে যুগোপযোগী করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদনের জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সংকটের সময় তিন বাহিনী যেন সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে অনুযায়ী সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। বিদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সদস্যরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে পেশাগত সাফল্য ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ছয়টি সামরিক ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করা হয়। ইউনিটগুলো হলো—৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টা, সেনাবাহিনী প্রধান, কূটনৈতিক কোরের প্রতিনিধিরা, সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।