ঢাকা, ৫ আগস্ট | চ্যানেল এস৫ অনলাইন:
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের প্রায় ১৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ এখন নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ভবনটি রূপান্তর করা হয়েছে ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ।
বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। আগামী বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
উদ্বোধনের পর থেকেই পশ্চিম দিকের প্রধান ফটকে জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় দেখা যায়। নির্ধারিত সময়ের পরও প্রবেশের অনুমতি না মেলায় অপেক্ষমাণ অনেকেই বৃষ্টির মধ্যেই অবস্থান নেন। পরে বিকেলের দিকে স্লোগান দিতে দিতে তারা জাদুঘর প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা
জাদুঘরের ভেতরে ঢুকতেই লাল ইটের পথের দুই পাশে নানা ফলজ গাছ দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। এই পথের পাশে নির্মিত হয়েছে ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধান ফটকের দক্ষিণ পাশের সবুজ মাঠে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই মেমোরিয়াল’। সাদা মার্বেল পাথরে বৃত্তাকারে নির্মিত এই স্মারকে হাজারো শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। এর মাঝখানে প্রতীকী কবরের আদলে সাজানো সবুজ অংশ এবং সামনে স্থাপিত রয়েছে একটি স্মারক ফলক।
জাদুঘরের চারপাশের মাঠজুড়ে রয়েছে জুলাই আন্দোলনের আলোচিত বিভিন্ন ঘটনার প্রতীকী ভাস্কর্য। এর মধ্যে রয়েছে গুলিবিদ্ধ মানুষের প্রতিকৃতি, আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগের দৃশ্য, নারী যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ, গুম, নির্যাতন এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক স্থাপনা। এছাড়া ‘আয়নাঘর’-এর আদলে একটি প্রতীকী বন্দিশালাও নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে গুম ও গোপন আটক সংক্রান্ত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে গণ–অভ্যুত্থানের সময়কার স্লোগান।
সাবেক গণভবনের দুইতলা ভবনটিকেই মূল জাদুঘর হিসেবে সাজানো হয়েছে।
নিচতলায় রয়েছে বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিও, নথি, দলিল, বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, নির্যাতন এবং আলোচিত ঘটনাগুলোর তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন। ভবনের কিছু কক্ষে অতীতের ভাঙচুরের চিহ্ন সংরক্ষণ করতে মেঝের ওপর বিশেষ কাচ বসানো হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা সেই অবস্থাই দেখতে পারেন।
এছাড়া এখানে বিভিন্ন নির্যাতনের প্রতীকী সরঞ্জাম, দলিলপত্র, ভিডিওচিত্র এবং বিভিন্ন আন্দোলনের স্মারক প্রদর্শন করা হয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ প্রদর্শনী। এখানে শত শত শহীদের ব্যবহৃত পোশাক, বই, খাতা, ব্যক্তিগত সামগ্রীসহ বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষণ করা হয়েছে।
একটি দীর্ঘ করিডোরে রয়েছে জুলাই আন্দোলনের দিনভিত্তিক টাইমলাইন, আলোকচিত্র, চিত্রকর্ম ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রদর্শনী। এছাড়া ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ নামে একটি ডিজিটাল কক্ষে ৩৬০ ডিগ্রি প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্ত প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা দর্শনার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার অনুভূতি দেবে।
নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, মিছিল, প্রতিবাদ, বিভিন্ন শিল্পকর্ম, ডিজিটাল পোস্টার ও ভাস্কর্যের মাধ্যমে আন্দোলনের নানা দিকও তুলে ধরা হয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় তোলা ছবি ও ভিডিও দিয়ে তৈরি থ্রিডি অ্যানিমেশন দেখছেন দর্শনার্থীরা।
একসঙ্গে অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপ এড়াতে প্রতিদিন তিনটি ধাপে জাদুঘর পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে—
জাদুঘর পরিদর্শনের পর দর্শনার্থীরা মাঠ, পুকুরপাড় ও ক্যাফেটেরিয়া এলাকায় সময় কাটাতে পারবেন।
অনলাইনের পাশাপাশি জাদুঘরের কাউন্টার থেকেও টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।