ঢাকা, ২০ জুলাই, ২০২৬ : ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সোমবার দায়িত্ব নিচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ২০১৬ সালের পর দেশটির ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করা ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন ৫৬ বছর বয়সী এই লেবার নেতা।
দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তাকে অর্থনৈতিক সংকট, সরকারি ঋণের চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কল্যাণ ব্যয় এবং অনিয়মিত অভিবাসনসহ একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজের নেতৃত্বের কার্যকর প্রমাণ দেওয়ার চাপও থাকবে তার ওপর।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন বার্নহ্যাম। মাত্র দুই বছর আগে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টিকে নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দিয়েছিলেন স্টারমার। তবে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং একের পর এক রাজনৈতিক বিতর্কের পর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
লন্ডন থেকে এএফপি জানায়, রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে স্টারমারের পদত্যাগের পর নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পাবেন বার্নহ্যাম। এরপর ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে প্রথম বক্তব্য দেবেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার আগে ‘দ্য টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্নহ্যাম বলেন, গত এক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটানোই তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন যেভাবে কাজ করেছি, তা কার্যকর হয়নি। তাই আমি ভিন্নভাবে কাজ করার চেষ্টা করব।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়ার কথা রয়েছে তার। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানোকে তিনি অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছে তার দল।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং লন্ডনের কেন্দ্রীয় সরকারের বাইরে অঞ্চলগুলোর হাতে আরও ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ও তার পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাবে।
সোমবারই নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করা হতে পারে। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী হিসেবে র্যাচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন, তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র বার্নহ্যাম উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে পরিচিত। লেবার পার্টির এমপিদের একটি বড় অংশ মনে করেন, অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজের জনপ্রিয়তা মোকাবিলায় বার্নহ্যামই দলের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব।
লেবার পার্টির উপনেতা লুসি পাওয়েল বলেন, স্থানীয় সরকার ও মেয়র হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে বার্নহ্যাম জানেন যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আরও বড় ও সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে। ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ সরকারি ঋণ, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার চাপ তার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ ছাড়া ছোট নৌকায় করে অনিয়মিত অভিবাসীদের ব্রিটেনে প্রবেশের ঘটনা নিয়েও সরকারকে কঠোর রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে। এসব ইস্যুতে রিফর্ম পার্টির জনসমর্থন বাড়ছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বার্নহ্যাম সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল নীতি ব্রিটিশ অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, সরকারি ব্যয় ও অর্থনীতি পরিচালনায় তিনি আগের সরকারের চেয়ে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করতে চান। প্রাথমিক বিনিয়োগ, আগাম পদক্ষেপ এবং জনগণকে নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনী প্রচারণার সময় সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ তিনি কাছ থেকে দেখেছেন বলেও জানিয়েছেন।
২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য থাকা বার্নহ্যাম টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে নিজেকে সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ভিডিওর মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন।
তবে তার সামনে সময় খুবই সীমিত। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জনমত জরিপে রিফর্ম পার্টির সম্ভাব্য উত্থানের ইঙ্গিত থাকায় লেবার সরকারের ওপর দ্রুত ফল দেখানোর চাপ বাড়ছে।
শুক্রবার সমর্থকদের উদ্দেশে বার্নহ্যাম বলেন, লেবার পার্টির জন্য জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ‘সঠিক কাজ করার এটাই শেষ সুযোগ’।
সোমবারের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় প্রথমে কেয়ার স্টারমার বাকিংহাম প্রাসাদে গিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এরপর ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে বিদায়ী বক্তব্য দেবেন তিনি।
পরে বার্নহ্যাম রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাজার কাছ থেকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। সেখান থেকে ফিরে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণ দেবেন।
নিজের প্রথম ভাষণকে বার্নহ্যাম ‘আত্মসমালোচনা ও দৃঢ় সংকল্পের মুহূর্ত’ হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। ব্রিটেনের সামনে থাকা সংকটগুলো সম্পর্কে জনগণের সঙ্গে সৎ থাকার পাশাপাশি পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিতে পারেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যামের জন্য এটি শুধু নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মুহূর্ত নয়; বরং লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করারও বড় পরীক্ষা।