ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৬: দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় সাধারণ জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গের পার্থক্য বুঝে সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। সাধারণ জ্বরে সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হলেও ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে অ্যাসপিরিনসহ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এমন ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ও গাঁটে গাঁটে ব্যথা এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, মশার কামড় থেকে সুরক্ষা এবং জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ—এই তিনটি বিষয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের ৫৯টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি বছরের ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ২০ জন। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯১১ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ও গাঁটে ব্যথা এবং র্যাশ দেখা দিলে ডেঙ্গুর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এ সময় নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দেন তিনি।
শিশুদের জ্বর হলে পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি ও শরবত পান করানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাইরে বের হলে শিশুদের ফুলপ্যান্ট, ফুলহাতা পোশাক ও মোজা পরানো ভালো।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে করোনা, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শুধু কীটনাশক প্রয়োগ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিস মশা সাধারণত অল্প গভীর ও পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। ফুলের টব, ছাদ বা বারান্দায় রাখা পাত্র, পুরোনো টায়ার কিংবা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি এ মশার প্রজননস্থল হতে পারে। তাই বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সূর্যোদয়ের পর প্রথম দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের দুই থেকে তিন ঘণ্টা এডিস মশা বেশি সক্রিয় থাকে। এ সময় মশার কামড় থেকে সুরক্ষায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ডেনভ-৩ সেরোটাইপের কারণে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই হতে পারে ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।