নবজাতকের জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। এতে শিশুর প্রয়োজনীয় সব ধরনের পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী উপাদান এবং সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান থাকে। তবুও অনেক পরিবারে শিশুর জন্মের পরপরই বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে নানা উদ্বেগ, ভুল ধারণা এবং অস্থিরতা দেখা যায়। এর ফলেই অনেক সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে কৌটার দুধ বা বোতলের দুধ খাওয়ানো শুরু হয়, যা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বব্যাপী বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হয়। এ উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি ও প্রচলিত ভুল ধারণা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অনেক সময় জন্মের পরপরই শিশুর দুধ খেতে কিছুটা সময় লাগে। এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে মাকে মানসিকভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সামান্য দেরি হলেই কৌটার দুধ শুরু করা উচিত নয়। কারণ গরুর দুধভিত্তিক ফর্মুলা কখনোই মায়ের দুধের বিকল্প হতে পারে না।

মায়ের দুধ খাওয়া শিশুর দিনে অনেকবার নরম বা পাতলা পায়খানা হতে পারে। বুকের দুধে থাকা ল্যাকটোজ শিশুর পরিপাক ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শুধু ঘন ঘন পাতলা পায়খানার কারণে মায়ের দুধ বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়, যদি না অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে।
অনেক সময় শিশু বুকের দুধ মুখে নিতে চায় না, আবার অনেক মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে গিয়ে দুধ খাওয়ানো কষ্টকর হয়ে ওঠে। এসব সমস্যার প্রধান কারণ হতে পারে ভুলভাবে শিশুকে স্তনে ধরানো।
সঠিক পদ্ধতিতে শিশুর পুরো শরীর মায়ের দিকে থাকবে এবং তার থুতনি স্তনের সঙ্গে স্পর্শ করবে। মায়ের উচিত স্তনকে এমনভাবে ধরে শিশুর মুখে দেওয়া, যাতে শুধু বোঁটা নয়, বোঁটার চারপাশের কালো অংশেরও বড় অংশ শিশুর মুখের ভেতরে যায়। এতে শিশু সহজে পর্যাপ্ত দুধ পায় এবং মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে।
জন্মের পর নবজাতক দীর্ঘ সময় ঘুমাতে পারে, যা স্বাভাবিক। শিশুকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। যখন সে হাত-পা নাড়বে, মুখে আঙুল দেবে বা ক্ষুধার ইঙ্গিত দেবে, তখনই তাকে বুকের দুধ খাওয়ানো সবচেয়ে উপযোগী।

প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ খেলে শিশু সুস্থ থাকবে (ছবিটি প্রতীকী)
অনেক অভিভাবক মনে করেন, শিশু কাঁদছে মানেই সে দুধ পাচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি শিশু দিনে অন্তত ছয়বার প্রস্রাব করে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় সে পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে। কান্নার পেছনে গরম, ঠান্ডা, অস্বস্তি বা অন্য কারণও থাকতে পারে।
অনেক কর্মজীবী মা বুকের দুধ পাম্প করে সংরক্ষণ করেন। এ ক্ষেত্রে বোতলের পরিবর্তে কাপ বা ছোট পাত্রে শিশুকে দুধ খাওয়ানো ভালো। কারণ বোতলে অভ্যস্ত হয়ে গেলে অনেক শিশু পরে মায়ের স্তন থেকে দুধ খেতে অনীহা দেখায়। শিশুর সরাসরি বুকের দুধ পান মায়ের শরীরে দুধ উৎপাদনও বাড়িয়ে দেয়।

প্রয়োজনে বের করে রাখা মায়ের বুকের দুধ সাধারণ তাপমাত্রায় প্রায় ৬ ঘণ্টা এবং রেফ্রিজারেটরে প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এরপর শিশুকে পরিষ্কার কাপ বা চামচের সাহায্যে সেই দুধ খাওয়ানো নিরাপদ।
শিশুকে আলাদা ঘরে না রেখে মায়ের কাছাকাছি রাখলে সে যখনই ক্ষুধার্ত হবে, তখনই দুধ খেতে পারবে। এতে বুকের দুধ খাওয়ানো সহজ হয় এবং মা-শিশুর মানসিক বন্ধনও আরও দৃঢ় হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য শুধু মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। সঠিক নিয়মে বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা গেলে শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বিকাশে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডা. তাহমীনা বেগম – শিশুরোগবিশেষজ্ঞ